একদিন এক অভাবী ব্যক্তি হযরত উমর (রা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে বললেন, "হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ আপনাকে যে বিশাল দায়িত্ব ও ক্ষমতা দিয়েছেন, সেখান থেকে আমাকে কোনো একটি পদের দায়িত্ব (চাকরি) দিন।"​হযরত উমর (রা.) ছিলেন দূরদর্শী। তিনি জানতেন, আমানতদারিতার জন্য কেবল যোগ্যতাই যথেষ্ট নয়, বরং অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকা জরুরি। তিনি লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি কুরআন পড়তে পারো?"
লোকটি লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করে উত্তর দিল, "না।"
উমর (রা.) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বললেন, "যে কুরআন পড়তে জানে না, আমরা তাকে কোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব দিই না।" এই কথাটি কোনো অবহেলা ছিল না, বরং এটি ছিলএকটি দিকনির্দেশনা। উমর (রা.) চেয়েছিলেন মানুষ যেন আগে দ্বীন শেখে। কারণ যার হৃদয়ে আল্লাহর কালামের নূর আছে, সে কখনো আমানতের খেয়ানত করতে পারে না।
লোকটি পদ পাওয়ার আশায় কোমর বেঁধে কুরআন শিখতে শুরু করল। তার মনে জেদ ছিল—কুরআন শিখলেই মিলবে কাঙ্ক্ষিত সেই রাজকীয় চাকরি। কিন্তু সময় বয়ে গেল। লোকটি কুরআন শিখল ঠিকই, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—কুরআন শেখার পর সে আর উমর (রা.)-এর দরবারে ফিরে এল না। সে যেন দুনিয়াবি পদের কথা বেমালুম ভুলেই গেল!
একদিন পথে হঠাৎ উমর (রা.)-এর সাথে তার দেখা। খলিফা তাকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি আমাদের ত্যাগ করলে? চাকরি পাওয়ার আশায় কুরআন শিখে এখন আর আমাদের কাছে এলে না যে?"
লোকটি মাথা উঁচু করে দাঁতব্যপ্ত হাসি দিয়ে যা বলল, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
সে বলল: "হে আমীরুল মুমিনীন! আমি আপনাকে ত্যাগ করিনি। বরং আমি কুরআন শিখেছি আর এই কুরআনই আমাকে উমর এবং উমরের দরজার মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্তি দিয়ে দিয়েছে। আমি এমন এক মালিককে খুঁজে পেয়েছি, যাঁর কাছে চাওয়ার পর আর কোনো মানুষের দোরগোড়ায় যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।"
হযরত উমর (রা.) বিস্মিত হলেন। তিনি গভীর কৌতূহলে জানতে চাইলেন, "কুরআনের কোন আয়াত তোমাকে এতটা স্বাবলম্বী আর নিশ্চিন্ত করল?"
লোকটি তখন তিলাওয়াত করল সূরা তালাকের সেই অমিয় বাণী:

وَمَنْ يَّتَّقِ اللّٰهَ يَجْعَلْ لَّهٗ مَخْرَجًا ۙ. وَّيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ؕ وَمَنْ يَّتَوَكَّلْ عَلَي اللّٰهِ فَهُوَ حَسْبُهٗ


“ যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার) কোন না কোন পথ বের করে দিবেন। আর তাকে রিযক দিবেন (এমন উৎস) থেকে যা সে কল্পনাও করতে পারে না। যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। ”


(সূরা তালাক: ২-৩)

এই ঘটনাটি আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কিছু অমূল্য শিক্ষা দেয়:
বিপদের প্রকৃত সমাধান তাকওয়া:
আমরা যখন সমস্যায় পড়ি, তখন কেবল বাহ্যিক উপায় খুঁজি। কিন্তু কুরআন আমাদের শেখায়, সমস্যা থেকে উত্তরণের আসল চাবিকাঠি হলো 'তাকওয়া' বা আল্লাহর সচেতনতা। আপনি যদি আপনার স্রষ্টাকে ভয় পান, তবে পুরো পৃথিবী আপনাকে ভয় পেতে শুরু করবে এবং আপনার সব পথ সহজ হয়ে যাবে।
রিজিক মানুষের হাতে নয়:
​ আমরা প্রায়ই মনে করি অমুক বস বা অমুক ব্যক্তি খুশি থাকলে আমার পদোন্নতি হবে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, মানুষের হাত কেবল মাধ্যম মাত্র, রিজিকের উৎস স্বয়ং আল্লাহ। যখন আপনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) করবেন, তখন তিনি এমন জায়গা থেকে সাহায্য পাঠাবেন যা আপনার গণনার বাইরে।
কুরআন কেবল তিলাওয়াতের জন্য নয়:
​ কুরআন কেবল বই নয়, এটি জীবনের সংবিধান। এই ব্যক্তিটি যখন কুরআন পড়ল, তখন সে কেবল শব্দগুলো শেখেনি, বরং এর মর্মার্থ উপলব্ধি করেছিল। কুরআনের সাথে সম্পর্ক গভীর হলে মানুষের আত্মসম্মানবোধ বেড়ে যায়; সে আর কারো সামনে মাথা নত করে না।
​প্রশান্তি আছে অল্পে তুষ্টিতে:
রাজকীয় পদের চাকরিতে হয়তো অনেক অর্থ ছিল, কিন্তু কুরআনের ওই আয়াতে লোকটি যা খুঁজে পেয়েছিল তা হলো 'কলবের গনি' বা হৃদয়ের সচ্ছলতা। দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি সে-ই, যার অন্তর আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট।
শেষ কথা
আজ আমরাও হয়তো সেই লোকটির মতো চাকরির জন্য, সম্মানের জন্য কিংবা একটু সচ্ছলতার জন্য মানুষের দরজায় কড়া নাড়ছি। কিন্তু আমরা কি একবারও সেই মালিকের দরজায় দাঁড়িয়েছি যিনি সব ক্ষমতার উৎস? আসুন, কুরআনের ছায়াতলে ফিরে যাই। যখন আপনার সাথে আপনার স্রষ্টার সম্পর্ক মজবুত হবে, তখন আপনিও অনুভব করবেন যে—আপনি আর কারো মুখাপেক্ষী নন, কেবল আল্লাহর মুখাপেক্ষী।