তখনকার কথা, যখন ইসলামী ফিকহ ও হাদিসের আকাশে সূর্য হয়ে জ্বলছিলেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র.)। বৃদ্ধ বয়সে একদিন তিনি ভ্রমণে বের হলেন। পথে এশার নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গেলে তিনি কাছের একটি মসজিদে ঢুকলেন। রাত হয়েছে, তাঁকে অনেক দূর যেতে হবে। তিনি চিন্তা করলেন ফজরের নামাজ পড়েই এ মসজিদ থেকে আবার যাত্রা শুরু করবেন। তিনি নামাজ পড়ে মসজিদে বসে থাকলেন। তাঁকে নামাজের পরও মসজিদে বসে থাকতে দেখে মসজিদের দ্বাররক্ষী এসে বললেন, রাতে মসজিদে থাকা যাবে না। মুসলিম জাহানের শ্রেষ্ঠ ইমাম হওয়া সত্ত্বেও নিজের পরিচয় গোপন রেখে তিনি নিঃশব্দে বেরিয়ে এলেন শীতের সেই হিমেল রাতে।

মসজিদের বাইরেই ছিল একটা রুটির দোকান। আহমাদ ইবনে হাম্বল যুবক দোকানদারকে সালাম দিয়ে বললেন, ‘শীতের রাত। আমি কি তোমার কাছে আগুন পোহাতে পোহাতে রাতটা কাটিয়ে দিতে পারি?’ দোকানদার বললেন, ‘এখানে আগুন পোহাতে পোহাতে রাত কাটালে আমার কোনো সমস্যা নেই।’
কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি যা দেখলেন, তাতে তাঁর দীর্ঘ জীবনের অর্জিত জ্ঞান এক নতুন বিস্ময়ের মুখোমুখি হলো।​ইমাম দেখলেন, যুবক দোকানদার রুটি বানানোর প্রতিটি ধাপে—খামির মাখা থেকে শুরু করে ক্রেতার হাতে রুটি তুলে দেওয়া পর্যন্ত—তার ঠোঁট দুটি বিরামহীন নড়ছে। যুবকটি অস্ফুট স্বরে বারবার পড়ছে, ‘আসতাগফিরুল্লাহ’।
যুবকটি রুটির খামির তৈরি করতে করতে বলছেন, ‘আসতাগফিরুল্লাহ’, বেলুন দিয়ে রুটি বানাতে বানাতে বলছেন, ‘আসতাগফিরুল্লাহ’, ক্রেতার হাতে রুটি তুলে দিতে দিতে বলছেন, ‘আসতাগফিরুল্লাহ’, টাকা নিতে গিয়েও বলছেন, ‘আসতাগফিরুল্লাহ’। অর্থাৎ সব কাজেই যুবকটি শুধু বলছেন, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’।
আহমাদ ইবনে হাম্বলের কৌতূহল বেড়ে গেল। বললেন, ‘যুবক! আমি আসার পর থেকেই দেখছি আপনি কিছুক্ষণ পরপর শুধু পড়ছেন‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’। কেন আপনি এত ইস্তিগফার করছেন?
যুবকটি এক চিলতে হাসি দিয়ে জবাব দিল, "হে মুসাফির! এই ইস্তিগফারের বরকতে আল্লাহ আমাকে 'মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ' বানিয়ে দিয়েছেন। আমি যা চাই, আল্লাহ তা-ই কবুল করেন। জীবনের সব চাওয়া তিনি পূর্ণ করেছেন, কেবল একটি দোয়া ছাড়া।"
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। তিনি প্রশ্ন করলেন, "সেই দোয়াটি কী?"
​যুবকটি নিশ্বাস ফেলে বলল, "আমি অনেকদিন ধরে আল্লাহর কাছে আকুতি জানিয়েছি যেন জীবনের শেষবেলায় একবার হলেও এই জামানার শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের সাথে দেখা করতে পারি। কিন্তু তাঁর দেখা এখনো পাইনি।"
যুবকের কথা শুনে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র.) স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রুধারা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘আপনার কবুল না হওয়া দোয়াটাও আজ কবুল হলো। আপনার সামনে আমিই আহমাদ ইবনে হাম্বল। নিশ্চয় আপনার দোয়ার কারণে আল্লাহ আমাকে মসজিদ থেকে বের করে দিয়ে আপনার দোরগোড়ায় টেনে এনেছেন।’
যুবকটি আনন্দে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এক সাধারণ রুটিওয়ালার ইস্তিগফারের টানে খোদ ইমামকে পায়ে হেঁটে তাঁর দরজায় আসতে হলো—এ যেন এক অলৌকিক প্রেম উপাখ্যান!

শেষ কথা
গল্পটি কেবল ইতিহাসের পাতায় পড়ার জন্য নয়, বরং আমাদের জীবনকে বদলে দেওয়ার জন্য। আপনার জীবন কি সংকটে বন্দি? আপনার চাওয়াগুলো কি অপূর্ণ রয়ে যাচ্ছে? তবে আজ থেকেই সঙ্গী করে নিন 'ইস্তিগফার'কে।​হয়তো আপনার একটি বিনয়ী 'আসতাগফিরুল্লাহ' আসমানের দরজাগুলো এমনভাবে খুলে দেবে, যা আপনি কল্পনাও করেননি। ইমামকে যেভাবে রুটিওয়ালার দরজায় পাঠানো হয়েছিল, আপনার গন্তব্যও হয়তো আপনার কাছে এভাবেই ধরা দেবে।
আসুন, আমরা আমাদের প্রতিটি নিশ্বাসে ইস্তিগফারকে মিশিয়ে নিই। কারণ,

যে ক্ষমা চাইতে জানে, সে কখনো রিক্ত হাতে ফেরে না